সময় ফুরিয়ে গেলে পৃথিবী আর কাউকে আলি’ঙ্গন ক'রে রাখে না। নিষ্ঠুরভাবে বলে দেয়, বিদা’য়! হয়তো গানের সুরে সেকথা আরও সহজ ক'রে দিয়েছিলেন কিংবদন্তি এন্ড্রু কিশোর। শিল্পীর কণ্ঠে যে আর কখনও শোনা যাবে না নতুন গান, এই সত্যটা কিছুতেই মানতে পারছেন না তার ভক্ত-অনুরা'গীরা।

এন্ড্রু কিশোরের দরাজ কন্ঠের সুর প্রা'য় চার প্রজ’ন্মকে মাতিয়ে তুলেছেন। ক্যারিয়ারে ১৫ হাজারের বেশি গানে কন্ঠ দিয়েছেন তিনি। বাংলা গানে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধি। অর্জনের ঝুলিতে জমা প’ড়েছে রেকর্ড পরিমান ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

তবে জা’নেন কি, নিজে'র জীবনের গল্পটা অন্যভাবে সাজাতে পারতেন এন্ড্রু কিশোর? যেমনটা সাজিয়েছেন সত্যজিৎ রা'য় , ঋতিক ঘটক, সুচিত্রা সেনের মতো কিংবদন্তিরা। ঠিক তেমনই ঢাকায় সিনেমা’র ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ না হয়ে বলিউডের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হতে পারতেন তিনিও। কিন্তু সেটা ক'রেননি বাংলা গানের রাজপুত্র।

এন্ড্রু কিশোরের দরাজ কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে বলিউডের কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক আরডি বর্মন নিজেই তাকে হিন্দি গান গাইতে এবং মুম্বাইয়ে স্থা’য়ী হওয়ার প্র'স্তা'ব দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশের টানে বিনয়ের স’ঙ্গে সেই প্র'স্তা'ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই সঙ্গীতশিল্পী।

জীবিত থাকাকালীন সময়ে এক সাক্ষাৎকারে সেই ঘ’টনার কথা নিজেই জা’নিয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। তিনি বলেছিলেন, একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে আরডি বর্মনের সুরে গান গেয়েছি। ১৯৮৫ সালে দুই বাংলার প্রযোজনায় ‘শত্রু’ সিনেমায় ৩ টি গান গেয়েছিলাম। দুইটি হিন্দিতে ও একটি বাংলায়। স্বনামধন্য গীতিকার মাজরু সুলতানপুরির দুটি হিন্দি গানের পাশাপাশি বাংলা ‘মুখে বলো তুমি হ্যাঁ’, ‘এর টুপি এর মাথায়’, এবং ‘আজো বয়ে চলে পদ্মা মেঘনা’ গানগুলো গেয়েছিলাম।

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জা’নিয়েছিলেন, এসব গান ক’রতে গিয়ে মুম্বাইয়ে আমা’র যাওয়া আসা শুরু হলো। তখনই আরডি বর্মনের স’ঙ্গে আমা’র ভালো একটি স’স্পর্ক তৈরী হয়। কখনোই তিনি আমা’র নাম ধ’রে ডাকতেন না, আদর ক'রে ‘ঢাকাইয়া’ বলতেন। সেসময় তিনি বলতেন, ‘ঢাকাইয়া’ তোকে ডেকে এনে এখানে গান গাওয়ানো সম্ভব না। তবে একটা কাজ ক’রতে পারিস, এখানে তুই স্থা’য়ী হয়ে যা। ভালো একজন মেয়েকে বিয়ে ক'রে মুম্বাইয়ে স্যাটেল হয়ে যা। বলিপাড়ায় ক্যারিয়ার গড়। বাকিটা আমিতো আছিই, চিন্তা করিস না।

এন্ড্রু কিশোর এই প্র'স্তা'ব পেয়ে কোনো বিলম্ব না ক'রেই আরডি বর্মনকে বলেছিলেন, ‘দাদা, এটা আমা’র জায়গা না। আমা’র দেশের মাটিতে আমি বেশ ভালো আছি। সত্যি বলতে এই জগৎটা আমা’র জন্য না।’ শিল্পীর এমন সাহসী মন্তব্য শুনে তাকে বুকে জড়ে নিয়েছিলেন বর্মন। তখন তিনি বলেছিলেন, তুই বাঘের বাচ্চা। আজ পর্যন্ত এমন কাউকে খুঁজে পেলাম যে, আমা’র দেওয়া প্র'স্তা'ব ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তুই একমাত্র শিল্পী যে আমা’র মুখের উপরে না ক'রে দিলো।’

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব